নতুন সরকারকে বাস্তববাদী হতেই হবে
নতুন সরকারকে আদর্শিক নয়, বরং বাস্তববাদী হতে হবে। অবিতর্কিত ও পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন নতুন সরকারের সামনে এটাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। যে বাস্তববাদিতার মতো জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আদর্শিক অতিকথনের চাপে হারিয়ে ফেলেছিল সদ্য-অতীতে লজ্জাজনক ভাবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। আদর্শবাদ তাদের যোগ্য ও দক্ষ শাসক করতে পারে নি; বরং দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের কলঙ্ক লাগিয়ে রাজনীতির মূলস্রোত থেকেই আপাতত বিতাড়িত করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাছাইভিত্তিক শিল্প সহায়তা নিছক সুরক্ষাবাদ নয়। এটি স্বীকার করে যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই রাষ্ট্র-নির্ধারিত হয়ে উঠছে। প্রধান অর্থনীতিগুলো কৌশলগত শিল্পখাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি কঠোরভাবে লেসে-ফেয়ার নীতিতে অটল থাকে, তবে তা বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের সর্বনিম্ন ধাপেই আটকে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আর্থিক সহনশীলতা আরেকটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা এখনো ব্যাপকভাবে ডলারকেন্দ্রিক। নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাগুলো দেখিয়েছে, কীভাবে আর্থিক নেটওয়ার্কগুলো ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের কোনো চরমপন্থী মুদ্রানীতি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। তবে শক্তিশালী রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, অর্থায়নের বহুমুখীকরণ এবং সতর্ক ঋণ তদারকি অপরিহার্য। আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নয়; এটি ভূরাজনৈতিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ সূক্ষ্মতা দাবি করে। ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তানের সঙ্গেও সংযোগ বৃদ্ধির তাগিদ দেয়। জ্বালানি, সংযোগ, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও পানি ব্যবস্থাপনায় গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি করার মাধ্যমে এই সম্পর্কের স্থিতিশীলতা মৌলিক গুরুত্ব বহন করে। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও উৎপাদনে চীনের সঙ্গে এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও শাসন সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা একচেটিয়াভাবে নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। রাষ্ট্রকৌশলের মূল দক্ষতা হবে প্রতিটি অংশীদারকে বোঝানো যে বাংলাদেশের বহুমুখীকরণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী করে।
এই ভারসাম্য রক্ষায় অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। খণ্ডিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে ভূঅর্থনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বাণিজ্য আলোচক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, জ্বালানি পরিকল্পনাবিদ এবং সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও কূটনীতিকদের একটি সমন্বিত কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে। সরকারের কাজে সমন্বয়ের অভাবে্ হলে নীতিনির্ধারণ হবে প্রতিক্রিয়াশীল, জাতীয় অগ্রাধিকারের পরিবর্তে বহিরাগত চাপ দ্বারা প্রভাবিত।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এই সমন্বয়কে কঠোরভাবে পরীক্ষা করবে। অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হ্রাস পেলে উৎপাদনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নতুন ছাড় আদায়ের প্রলোভন দেখা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি—উচ্চতর উৎপাদনশীলতা, উন্নত দক্ষতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রপ্তানির বহুমুখীকরণ। কর্মসংস্থান অস্থিতিশীল না করে এই রূপান্তর পরিচালনা করতে পারার ওপর নতুন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার একটি অংশ নির্ভর করবে।
পরিশেষে সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, কৌশলগত দিগন্ত তাৎক্ষণিক সময়সীমার বাইরে বিস্তৃত। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে একটি বহুমুখী উৎপাদন ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত হতে পারে। অথবা এটি সীমিত রপ্তানি ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল থেকে বহিরাগত ধাক্কা ও কৌশলগত চাপে দুর্বলই থেকে যেতে পারে। এই পার্থক্য কেবল বৈশ্বিক শক্তির দ্বারা নির্ধারিত হবে না; বরং নতুন সরকার অর্থনীতিকে কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে।
এক এমন বিশ্বে, যেখানে বাণিজ্যপথ চাপের বিন্দুতে পরিণত হতে পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, পরিকল্পনাহীন নিরপেক্ষতা প্রজ্ঞা নয়—এটি ঝুঁকি। বাংলাদেশের সুযোগ হলো এমনভাবে একীভূত হওয়া যে তাকে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন এমনভাবে বহুমুখী হওয়া যে তাকে জোরপূর্বক প্রভাবিত করা কঠিন, এবং এমনভাবে মূল্যবান হওয়া যে তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।
ভূঅর্থনৈতিক যুগ এসে গেছে। নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ হলো বুঝতে পারা যে পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক করিডোরে পরিচালিত হয় না। এটি পরিচালিত হয় কারখানায়, বন্দরে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এবং প্রযুক্তি পার্কে। বাংলাদেশ যদি এসব ক্ষেত্রকে একটি সুসংহত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে সমন্বিত করতে পারে, তবে তা কেবল পরিবর্তিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে না—বরং এর ভেতরে নিজের অবস্থান নিজেই গড়ে নেবে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন