পঞ্চগড়ে হোমিও চিকিৎসার আড়ালে খুলে বসেছেন প্রতারণার দোকান
পঞ্চগড় শহরে হোমিও চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত সত্যেন্দ্রনাথ রায়। তবে গত কয়েক বছর ধরে চিকিৎসার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করছেন একটি প্রতারণা চক্র। বিভিন্ন সময়ে এই চক্রের ফাঁদে প্রতারণার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেকেই।
অভিযোগ উঠেছে- একেক সময় একেক পদ্ধতিতে প্রতারণা করে সত্যেন্দ্রনাথ রায় ও তার চক্রটি। সম্প্রতি ‘অপুলেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের ফুড সাপ্লিমেন্ট পণ্যকে ঔষধ হিসেবে বিক্রি করে প্রতারণার দোকান খুলেছেন।
অভিযোগ রয়েছে- চক্রটি এমএলএম পদ্ধতিতে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সদস্যদের মডিফাই করে। চক্রটি ভারতীয় ঔষধ বলে স্থানীয় সহজ সরল অসুস্থ্য মানুষকে প্রতারিত করছে। ঔষধ হিসেবে উচ্চ দামের এসব পণ্য সেবন করে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন অনেকে।
অভিযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ রায় পঞ্চগড় জেলা শহরের বানিয়া পট্টিতে ‘রায় হোমিও হল’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি পঞ্চগড়ের ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজে শিক্ষকতাও করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- ফুড সাপ্লিমেন্ট পণ্যটিকে ঔষধ হিসেবে ব্যাপক প্রচার করছে চক্রটি। জন্ডিসের ওষুধ থেকে শুরু করে ডায়াবেটিক,
লিভার, হাড়ক্ষয়, দৃষ্টিশক্তি, জ্বর, কাশি, কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইলস, কোলেস্টেরল, ওজন কমানো ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করবে বলে প্রচারণা চালানো হয়। নতুন সব রোগীকে দেওয়া হয় ‘অল ইন ওয়ান’ নামের একটি বোতল। বোতলের দাম নেয়া হয় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। যদিও বোতলের মোড়কে মূল্য উল্লেখ নাই।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন বিকেল হলেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা চক্রটির সদস্যরা ভির করেন রায় হোমিও হলে। যাদের মধ্যে রয়েছে বেকার তরুন-তরুনী, স্বামী পরিত্যক্তা নারী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও চাকুরিজীবিরাও। এদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মার্কেটিং কৌশল শেখান দোকানের কর্মচারী রেজাউল। ফলে প্রলুব্ধ চক্রটি লাভের আশায় ফুড সাপ্লিমেন্ট পণ্যকে প্রচার করছে ভারতীয় ঔষধ হিসেবে। আর হোমিও চিকিৎসক সত্যেন্দ্রনাথ রায়কে তুলে ধরছেন ভারতীয় চিকিৎসক হিসেবে।
হাড়িভাসা এলাকার নিরলা রায়। পেটে পাথর হলে স্থানীয় শহিদুল নামের এক বয়স্ক লোকের মাধ্যমে এখানে আসেন তিনি। এসে প্রতারিত হয়েছেন দাবি তার। তিনি বলেন, ১১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে দেড় মাস ঔষধ খেয়েছি, কিন্তু কোন কাজ হয়নি। পরে আরো ৫ মাস ঔষধ খেতে বলেছেন তারা।
মোহাম্মদ আলী নামে একজন জানান, কোমরের ব্যথার জন্য লোকের কথায় বিশ্বাস করে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ঔষধ নিয়েছেন, কোন কাজ হয়নি।
এমদাদুল হক নামে একজন বলেন, পায়ের ব্যথার জন্য সাড়ে ৪ হাজার টাকা দিয়ে এক বোতল ঔষধ খেয়েছি সাড়েনি। পরে আবার আরেকটা নিয়েছি, তবে মনে হয়না সাড়বে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোপূর্বে ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি ব্র্যান্ডের পণ্য এমএলএম পদ্ধতিতে বাজারজাত করে প্রতারণা করেছেন রায় হোমিও হলের স্বত্বাধিকারী সত্যেন্দ্রনাথ রায়। পরে তিনি ‘অনপেসিভ’ নামের ভারতীয় একটি অনলাইন প্লাটফর্মের সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন স্থানীয়দের। লাভের আশায় এই প্লাটফর্মে ইনভেস্ট করে প্রতারিত হয়েছেন এখানকার শত-শত বেকার ও পেশাজীবী। সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের মাধ্যমে এমএলএম পদ্ধতিতপ এখান থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ‘অনপেসিভ’।
ভুক্তভোগীরা জানান, ‘অনপেসিভ’ ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, ই-মেইল, জুম এপসহ বিভিন্ন এপসের বিকল্প হিসেবে নিজস্ব এপস তৈরি করবে। এজন্য ফাউন্ডার হিসেবে তাদের কাছে ইনভেস্ট নেয়া হয়েছে। তাদেরকে প্রলোভন দেখানে হয়েছিলো- ফেসবুক-ইউটিউবের মালিক যেমন আয় করে অনপেসিভও এমন আয় করবে। আর আয়ের লভ্যাংশ আজীবন বসে বসেই পাবেন ফাউন্ডাররা।
হাফিজুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, লোভে পড়ে ৭০ হাজার টাকা ইনভেস্ট করেছি। আমাদেরকে আশা দেয়া হয়েছিল, ভালো কিছু হবে। তবে এখন আশা ছেড়ে দিয়েছি।
আজাদ নামে এক প্রবাসী বলেন, আমাকে প্রচুর আয়ের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। প্রবাসের ভিসা বাতিল করেছি এটার আশায়। কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থেকেও সম্ভাবনা না দেখে, আবার প্রবাসে আসছি। মাঝখানে সময় ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হোমিও চিকিৎসক সত্যেন্দ্রনাথ রায় জানান, ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ পণ্যকে ঔষধ না বলতে, তার লোকজনকে সতর্ক করবেন। অনপেসিভ প্রসঙ্গে বলেন, এটার কাজ চলমান আছে, তবে এখনো আয় শুরু হয়নি।
পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা.মিজানুর রহমান জানান, তার চিকিৎসা কেন্দ্রিক অভিযোগের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন