জাল দলিল ও প্রতারণার অভিযোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কারাগারে
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় জমি দখলের উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি ও প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলায় খামার বিষ্ণুগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কেশব চন্দ্র রায়কে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গত বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে দিনাজপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, খানসামা এ আদেশ দেন। একই মামলায় আরও দুই আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদেরও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার বাদী উপজেলার ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের খামার বিষ্ণুগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা রূপ নারায়ন। তিনি আদালতে দায়ের করা মামলায় মোট আটজনকে আসামি করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে বাদীর মালিকানাধীন জমি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে জাল কাগজপত্র তৈরি করেন এবং সেই কাগজ ব্যবহার করে একটি ভুয়া দলিল রেজিস্ট্রি করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি ২৫৮/২০১৯ নম্বর দলিলটি তৈরি করা হয়। দলিলে ডিপি খতিয়ান নম্বর ৪৭৫ এবং আরএস খতিয়ান নম্বর ২৯২৭ উল্লেখ করা হলেও তদন্তে এসব তথ্য অসত্য বলে প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে উল্লিখিত আরএস খতিয়ানের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দলিলে মৃত রঘুনাথ মহন্তকে নিঃসন্তান দেখিয়ে প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের তথ্য গোপন করার অভিযোগও রয়েছে।
মামলার বিবরণে বলা হয়, কেশব চন্দ্র রায় ওই ভুয়া দলিলের গ্রহীতা হিসেবে উল্লেখিত। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জেনেশুনেই জাল দলিল তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। অন্য আসামিদের মধ্যে প্রকাশ চন্দ্র রায়, বিফুল চন্দ্র রায় ও রবিন চন্দ্র রায় দাতা হিসেবে এবং আরও কয়েকজন সাক্ষী ও সহযোগী হিসেবে জড়িত ছিলেন। পুরো বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে বলে বাদীর দাবি।
রূপ নারায়ন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই জমির বৈধ মালিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। কিন্তু আসামিরা কোনো স্বত্ব না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে দলিল তৈরি করে জমিটি দখলের অপচেষ্টা চালান। বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে দলিলের কপি সংগ্রহ করেন এবং এতে একাধিক অসংগতি দেখতে পেয়ে আইনের আশ্রয় নেন।
বাদীর আরও অভিযোগ, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বিকেলে তিনি আসামিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে তারা জাল দলিল তৈরির বিষয়টি অস্বীকার না করে বরং তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করেন। জমি ছেড়ে না দিলে গুরুতর পরিণতির হুমকিও দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে, সহকারী শিক্ষক কেশব চন্দ্র রায় গত কয়েকদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকতার মতো দায়িত্বপূর্ণ পেশায় যুক্ত একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
খামার বিষ্ণুগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতি বালা রায় বলেন, কেশব চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। এতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। আমরা চাই, বিষয়টির দ্রুত ও সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হোক, যাতে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক থাকে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মামলাটি ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এবং দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৫০৬(২) ধারায় দায়ের করা হয়েছে। শুনানি শেষে আদালত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা বিবেচনায় প্রকাশ চন্দ্র রায় ও বিফুল চন্দ্র রায়ের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে কেশব চন্দ্র রায় ও রবিন চন্দ্র রায়কে কাস্টডি ওয়ারেন্টের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। অপরদিকে, আসামি দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়ের বয়স বিবেচনায় তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করা হয়। তাকে দুই হাজার টাকা বন্ডে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মামলার আরও তিন আসামি—জাফরুল ইসলাম, বনমালী দাস ও দলিল লেখক কে—সমন পাওয়ার পরও আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পরোয়ানা কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
স্থানীয়দের মতে, একজন শিক্ষক হয়ে এ ধরনের অভিযোগে জড়িত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন