ভালো ফলন, তবু হতাশা— ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় সোনালি ধানের মাঠ জুড়ে এখন ব্যস্ততা। রাতদিনের পরিশ্রম আর ভালো ফলনের আশায় কৃষকেরা ঘরে তুলছেন হাজার হাজার মণ ধান। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ধানের দাম কম থাকায় মুখে হাসি নেই কৃষকদের। বরং লোকসানের শঙ্কায় দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন তারা।
চলতি মৌসুমে খানসামা উপজেলায় ১৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৭৫৭ হেক্টর জমিতে। এসব জমি থেকে উৎপাদন হয়েছে ৪৮ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন ধান। কৃষি বিভাগ বলছে, ফলন সন্তোষজনক হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় কৃষকেরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
উপজেলার পাকেরহাট ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দাম প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। বর্তমানে বি আর–৫১ জাতের প্রতি বস্তা (৮০ কেজি) ধান বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকায়। একই দামে বিক্রি হচ্ছে গুটি স্বর্ণ জাতের ধান। জিরা–৯০ জাতের ধানের দাম প্রতি বস্তা ২ হাজার ৩০০ টাকা।
মাজারডাঙ্গা গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম বলেন, “আমি তিন বিঘা জমিতে স্বর্ণ–৫ জাতের ধান চাষ করেছি। মোট ৭০–৮০ মণ ধান পেয়েছি। কিন্তু সার, বীজ, কীটনাশক আর শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে ৬০–৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচও উঠছে না।”
পাকেরহাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক আনিছুর রহমান জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে তার খরচ হয়েছে ২৬ হাজার টাকার বেশি। তিনি বলেন, “ভালো ফলন পেয়েও কম দামের কারণে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।”
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক জমির ধান পড়ে গেছে। এতে কাটামাড়াইয়ে অতিরিক্ত শ্রমিক লাগছে, ফলে খরচ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি ভেজা ও ক্ষতিগ্রস্ত ধান কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। কিছু ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে খাদ্য বিভাগ। বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি কেজি ৩৪ টাকা দরে এ পর্যন্ত ১৪১ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই সংগ্রহ কার্যক্রম খুবই সীমিত হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়ছে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, “লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে ধান আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন ভালো হয়েছে। বর্তমানে ধানের দাম কিছুটা কম থাকলেও সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম বাড়ানো হলে ধীরে ধীরে দাম স্থিতিশীল হবে।”
তবে কৃষকেরা আশ্বাস নয়, বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ দেখতে চান। তাদের দাবি, দ্রুত ও মাঠপর্যায়ে সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করা না হলে ভালো ফলনের এই মৌসুমও তাদের জন্য স্বস্তির বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন