অস্তিত্ব সংকটে ব্রহ্মপুত্র নদ, হেঁটেই পারাপার নাব্য সংকটে ভেঙে পড়ছে যোগাযোগ,বিপর্যস্ত চরাঞ্চলের জীবন
এক সময়ের প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদ আজ যেন তার নিজস্ব সত্তাই হারাতে বসেছে। ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নদীর বুকে পলি জমে জেগে উঠেছে ডুবোচর ও বিস্তীর্ণ বালুচর। পানি না থাকায় থমকে গেছে নৌযান চলাচল। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে নদী পার হতে হচ্ছে।
পানি শূন্য বালুচরগুলো এখন মরুভূমির মতো ধুধু প্রান্তর। কোথাও কোথাও ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পার হতে হচ্ছে নদীর বুক। এক সময় যেখানে ঢেউয়ের গর্জনে কেঁপে উঠত তীর, সেখানে এখন শুধু বালু আর বালু। যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ব্রহ্মপুত্র নদ শুকনো থাকায় চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহণে দেখা দিয়েছে মারাত্মক সংকট। চরাঞ্চলে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, সবজি ও পাট জেলার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও নদীপথ অচল হয়ে পড়ায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চরাঞ্চলের স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন খোলা বালুচর পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। ঘন কুয়াশা, প্রচণ্ড শীত ,রোদ কিংবা বর্ষায় এই যাত্রা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। চরাঞ্চলে কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতাল না থাকায় অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
ফুলছড়ি চরের বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, “আগে নৌকায় আধা ঘণ্টায় পার হতাম। এখন বছরের অর্ধেক সময় হেঁটে যাওয়া-আসা করতে হয়। বাচ্চা আর অসুস্থ মানুষ নিয়ে চলাচল করা খুব কষ্টের।”
গাবগাছি চরের রাজন শেখ বলেন, “নাব্য সংকট নিরসনে দ্রুত খনন দরকার। শুধু নামমাত্র কাজ করলে হবে না। নদী বাঁচলে চরবাসী বাঁচবে।”
পরিবেশ ও জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব নদীর এই সংকট শুধু যোগাযোগেই নয়, প্রভাব ফেলছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশেও। জেলে পরিবারগুলো মাছের অভাবে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নেমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, “উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, নদী ভাঙন এবং বর্ষাকালের পলিমাটি জমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদে নাব্য সংকট দেখা দিচ্ছে।”মাঝে মধ্যে নদীতে ড্রেজিং করে নৌপথ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে এই সংকট নিরসন বেশ চ্যালেঞ্জিং।’
এই নদীতে ১৬৫টি চর রয়েছে। এসব চরের মানুষ ছাড়াও বালাশী-বাহাদুরাবাদ ঘাট দিয়ে অন্তত ১০ জেলার মানুষ যাতায়াত করে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় ব্রহ্মপুত্র নদ শুধু নামেই নদী হয়ে থাকবে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রকে বাঁচাতে এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত খনন এবং উজান থেকে ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন