খানসামায় গরমের সঙ্গে লোডশেডিংয়ের দাপট, রাতে ঘুম নেই, দিনে স্বস্তি নেই—বিপর্যস্ত জনজীবন
দুপুর গড়াতেই ঘরের ভেতর বাতাস যেন থেমে যায়। ফ্যান ঘোরে না, দেয়াল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ে ঘাম। বাইরে সূর্যের তীব্র তাপ, ভেতরে অসহনীয় গরম—এর মধ্যেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। এমন বাস্তবতা এখন প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলাবাসীর। সাম্প্রতিক সময়ে এ চিত্র নিত্যদিনের।
গত কয়েকদিন ধরে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে অনিয়মিত ও ঘন ঘন লোডশেডিং। সকাল, দুপুর কিংবা গভীর রাত—কোনো সময়েরই নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টায় ১৫ থেকে ২০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে কখন আসবে, তা কেউ বলতে পারে না; অপেক্ষা শুধু দীর্ঘই হচ্ছে।
বিকেলের দিকে দেখা যায়, অসহনীয় গরমে অনেক শিশু ও বৃদ্ধ ঘরের ভেতরে থাকতে না পেরে গাছের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। কেউ খোলা মাঠে, কেউ বা বারান্দায় বসে একটু বাতাসের আশায় সময় কাটাচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে—মোটর চালানো যাচ্ছে না।
সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীরা গরমে ছটফট করছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আশরাফুল নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, “এই গরমে হাসপাতালে থাকা খুব কষ্টের। বিদ্যুৎ গেলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।”
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা
রাত নামলেই দুর্ভোগ যেন আরও বাড়ে। সামনে পরীক্ষা—কিন্তু পড়ার আলো নেই। শিক্ষার্থীরা মোমবাতি বা বিকল্প আলোয় পড়তে বসছে; গরমে চোখ জ্বালা করছে, মাথা ঝিমিয়ে আসছে। রফিকুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, “এমন গরম আর লোডশেডিংয়ে বাচ্চারা না ঘুমাতে পারে, না পড়তে পারে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।”
বাজারেও থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। দোকানে ক্রেতা ঢুকতেই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। ফ্রিজে রাখা পচনশীল পণ্য নষ্ট হচ্ছে, বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইনুল নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, “গরমে মানুষ দোকানে দাঁড়াতেই চায় না—ব্যবসা প্রায় বন্ধের মতো।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি বা আকাশে মেঘ দেখা দিলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ঝড় হলে তো দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকতে হয়।
এদিকে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল। বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা টিভির সামনে বসে খেলার অপেক্ষায় থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেই আনন্দও ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের একটাই দাবি—দ্রুত লোডশেডিংয়ের স্থায়ী সমাধান। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না হলে তীব্র গরমে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে, বাড়বে অসুস্থতা।
এ বিষয়ে খানসামা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এজিএম এএসএম রাকিবুল হাসান লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করে জানান, পুরো জেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের বরাদ্দ কিছুটা কম থাকায় বিভিন্ন সময়ে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
গরমের এই দুঃসহ দিনে খানসামার মানুষ তাই এখন শুধু বিদ্যুতের অপেক্ষায়—একটু আলো, একটু বাতাস, আর একটু স্বস্তির আশায়।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন