শহরের দরজায় জীর্ণ প্রহরী: ভরসার বাঁধ এখন আতঙ্কের কারণ
বর্ষা এলেই গাইবান্ধার মানুষ আতঙ্কে চোখ রাখেন ঘাঘট নদের দিকে। শহর বাঁচাতে ২০১৯ সালে যে বাঁধ গড়ে তোলা হয়েছিল সেই বাঁধই এখন ভরসার বদলে হয়ে উঠেছে ভয়ের কারণ। রক্ষক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতি বছর ক্ষয়ে যাওয়া সেই বাঁধের দেহে এখন অর্ধশতাধিক গর্ত। এ যেন এক জীর্ণ পাহারাদার মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের দরজায়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গাইবান্ধা শহরকে বন্যার ছোবল থেকে বাঁচাতে ২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন ব্রিজ থেকে পূর্ব কোমরনই কুঠিপাড়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে।
ওই বছরই ভয়াবহ বন্যায় জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের পর নির্মিত বাঁধটি শহরের মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিল আশার প্রতীক। কিন্তু সেই আশা বেশি দিন টেকেনি। নির্মাণের পর প্রথম বর্ষা থেকেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়তে শুরু করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজের কারণেই বাঁধ এত দ্রুত ভাঙছে- সামান্য বৃষ্টিতেই মাটি সরে যাচ্ছে, গর্ত তৈরি হচ্ছে, ধস নামছে।
সরেজমিন আলাপকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছরই একটা চক্রের মধ্যে আটকে যায় বাঁধের ভবিষ্যৎ। বর্ষায় ভাঙে, শুকনো মৌসুমে নামমাত্র মেরামত হয়, আবার বর্ষায় ভাঙে। এই ধস ঠেকাতে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বাঁধের মান এতটুকু বাড়েনি বলে তাদের অভিযোগ। এবার বর্ষার
শুরুতেই বাঁধের অন্তত পঞ্চাশটি স্থান ধসে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পানির উচ্চতা আরও বাড়লে এই গর্তগুলো দিয়ে অনায়াসে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে পুরো শহর তলিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী টেকসই সংস্কারের অভাবে বছরের পর বছর চরম দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন ঘাঘট নদ পাড়ের মানুষ। এই চক্র ভাঙার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলেই বাড়ছে তাদের ক্ষোভ।
অবশ্য দায়সারা সংস্কারের অভিযোগের দায় নিতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে দায়সারা সংস্কারের অভিযোগ অস্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন শরিফুল ইসলাম।
স্থানীয়রা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের মানুষ। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এই ফাঁকটাই তাদের সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা।
২০১৯ সালের বন্যার স্মৃতি এখনও গাইবান্ধাবাসীর মনে তাজা। সেই বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি এড়াতে এলাকার মানুষ চান দীর্ঘস্থায়ী ও মানসম্মত সংস্কার-
বরাদ্দ নয়, কাজের বাস্তব ফলাফল। তাদের দাবি একটাই, আর তা হলো- প্রতি বছরের ভাঙা গড়ার চক্রে না থেকে একবারে টেকসই সংস্কার করা হোক যাতে আর কোনো বর্ষায় শহর তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে রাত জাগতে না হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘাঘট নদের পানি যখন ফুলে ওঠে, তখন এই বাঁধের ওপরই নির্ভর করতে হয় হাজারো পরিবারকে। অথচ সেই বাঁধ এখন নিজেই বুকে অর্ধশতাধিক ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার কিনারে। কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পরিণত না হলে এবারের বর্ষাও হতে পারে আরেকটি দুঃস্বপ্নের মৌসুম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, শুধু বাঁধ নয়, ধুকছে ঘাঘট নিজেও। দশকের পর দশক ধরে ঘাঘটের দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা- পাকা বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পুরাতন ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে এই দখলদারি যে কেউ খালি চোখে দেখতে পান।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন