বাঁশের বাঁশির সুর আনন্দ বেদনার এক সংমিশ্রণ
মন মাতানো শ্রুতিমধুর সুর-ছন্দে বাজানো বাঁশের বাঁশি প্রাচীন একটি ঐতিহ্যবাহী বাদ্য যন্ত্র। যা রাজদরবার থেকে শুরু করে সর্বজনীন বিনোদনপ্রেমী বাঙালির সুস্থ বিনোদন ধারার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। এ বাঁশি দিয়ে মরমি সুরের দোলায় গানের বাণীকে ফুটিয়ে তোলা যায়। এ প্রকারের বাঁশের বাঁশিকে বলে আড় বাঁশি।
একসময় জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, পালাগান, ঘেটু, কবি গানের লোকসংগীত ও যাত্রা পালায় বাঁশির ব্যবহার হতো। যাত্রাগানের মরমী ও করুণ প্রেমের বিরাগী গানের কনসার্টে এই আড় বাঁশি না হলে সুরলহরী জমতোই না। কিন্তু কালের বির্বতনে ও আধুনিক যন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হাজার বছরের লালন করা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির সুরেলা ঐতিহ্যের বাঁশের বাঁশি সমাজ-সংস্কৃতি ও গানের মঞ্চ থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। এই বাঁশির নিরাকার সুরের মূর্ছনায় মন হারিয়ে যায়। যার করুণ সুর সহজেই সবার আবেগকে জাগিয়ে তোলে মায়াবি দোলায়। তাইতো গ্রামবাংলার অন্য অঞ্চলের ন্যায় একসময়ে গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাল থেকে কালান্তর এই বাঁশি ছিল প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, আবেগ-অনুরাগ ও আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ। যা সন্ধ্যাবেলায় গ্রামে-গ্রামে, তপ্ত দুপুরে রাখালি ও কৃষাণীর মাঠ থেকে সুরেলা কণ্ঠে বাঁশির করুণ সুর ভেসে আসত। এ ছাড়াও গ্রামীণ বৈশাখী মেলাসহ যে কোনো উৎসব পার্বনে, হাটে-বাজারে, রাস্তা-ঘাটে বাঁশিওয়ালাদের কণ্ঠে একই সুর বেজে উঠত। এই বাঁশির নিরাকার সুর গিয়ে বিঁধত মানুষের বুকে। তখন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা থমকে দাঁড়িয়ে, জটলা পাকিয়ে বাঁশির মনোমুগ্ধকর সুরে মুগ্ধ হয়ে পড়তেন। বাঁশির শুধু সুরেই নয়, এ শিল্পের উপর নির্ভর করে চলত অনেক নিম্নআয়ের পরিবারের জীবন-জীবিকা। দিন বদলে যাওয়ায় মোবাইল, কম্পিউটারসহ নানা আধুনিক প্রযুক্তির মাদকতায় বর্তমান প্রজন্ম ঝুঁকছে সেই দিকে। এতে করে সুরের মঞ্চে বাঁশির চাহিদা না থাকায় আর ওইসব জায়গায় বাঁশিওয়ালাদের আনাগোনা নেই, নেই বাঁশি বিক্রির ধুম। নেই রাখাল রাজাও। এতে করে তাদের সুরেলা কণ্ঠে আর ভেসে আসে না মর্মভেদী বাঁশির সুর।
এ সময় দেখা গেছে, গ্রামীণ মেলার এককোণে হরেক রং-বেরংয়ের বাঁশির পসরা সাজিয়ে বসে থাকতেন
বাঁশিওয়ালারা। বাঁশি দিয়ে মুখে তুলতেন নানা সুর। তাদের বাঁশির সুরেলা সুর মেলায় আগুন্তুকদের বিমোহিত করে তুলত। এ সময় সুরপাগল নানা বয়সি মানুষ হুমড়ি খেয়ে বাঁশি কেনতেন।
৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ রমজান আলী বলেন, আগে রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, এক কথায় সবার প্রিয় ছিল দুই অক্ষরের ফুঁৎকার বাদ্যযন্ত্র বাঁশের বাঁশি। আগে বাঁশির চাহিদা ও কদর ছিল। যা অনেকে বিক্রি ও সুর তুলে ভালো আয় রোজগার করত। আধুনিক যন্ত্রনির্ভর যুগে এখন আর বাঁশির কদর নেই বললেই চলে। তবু মাঝে মধ্যে বিভিন্ন মেলা উৎসব পার্বনে বাঁশি চোখে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, বাঙালির লোকশিকড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি সুস্থ মানবিকবোধ ও চেতনা বিকাশের মাধ্যমে পরিশীলিত সমাজ বিনির্মাণে এ বাঁশি রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বংশীবাদক বাচ্চু বলেন, অপার রহস্যময় মাদকতাময় এক যন্ত্রের নাম বাঁশি। বাঁশি হচ্ছে মানষিক উৎকর্ষতার অন্যতম হাতিয়ার। যা একসময় ভরদুপুরে বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে আমি নিজেও বাঁশি বাজিয়েছি। বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়েছি। এ ছাড়াও শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে ধানের শীষের ডগার বাঁশি, আষাঢ় মাসে আমের আটির বাঁশি ও গ্রামীণ মেলার তালপাতার বাঁশি বাজিয়ে। গ্রাম-বাংলার এ ঐতিহ্যবাহী বাঁশি যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। কবি-সাহিত্যিকরাও বাঁশি বাজিয়েছেন, বাঁশির সুরে বিমোহিত হয়েছেন। ছড়া, গল্প, কবিতা, নাটক-উপন্যাসে তাদের লেখনিতে বার বার উঠে এসেছে বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের সুর-ছন্দের বাঁশের বাঁশির কথা। এ ছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, বৈষ্ণবপদাবলী, কবিগান, লালনগীতি, বাউলগান, জারিসারি, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, যাত্রা পালাগান বাঁশি ছাড়া কল্পনাই করা যেত না। শুধু কি তাই? এই বাঁশি কত প্রেমিক জুটিকে জোড়া লাগিয়েছে, ঘর ছাড়া করেছে তার ইয়ত্তা নেই। কত প্রেমিক যে বাঁশির সুরের মূর্ছনায় সংজ্ঞা হারিয়েছেন। এ ছাড়াও এই বাঁশির সুরে অতীতে ফিরে যান অনেকে। এই বাঁশি একসময় হয়ে উঠত বিরহের মালা। তখনো দরাজ কণ্ঠে ভেসে আসত, বাঁশি শুনে আর কাজ নেই/ সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি.......। বাঁশি বাজে ওই দূরে/চেনা কি অচেনা সুরে/এ লগনে মন মোর/কিছুতে যে রয় না ঘরে। আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি...। এ রকম বাঁশি নিয়ে কত প্রেম বিরহসহ হৃদয় নিংড়ানো গান রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বাঙালির ঐতিহ্যের যত সুর আছে তার মধ্যে বাঁশির সুরের মতো মধুমাখা সুর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বর্তমান প্রজন্ম এ বাঁশি নিয়ে আর খেলা করে না। চরম আধুনিকতায় তারা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। এভাবেই সমাজে সামাজিক অবক্ষয় জেঁকে বসেছে। তাই যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়রোধে আলোকিত সমৃদ্ধি প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাঁশি হোক জাগরণের হাতিয়ার। যা রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন