পঞ্চগড়ে সরকারি বই বিতরণে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের বিনামূল্যে দেওয়া পাঠ্যবই কিন্ডারগার্টেনে সরবরাহকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ও পরিচালকদের দাবি, সরকারি বই পেতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়ে বই বিতরণে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন একাধিক শিক্ষক।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি শিক্ষাবর্ষে দেবীগঞ্জ উপজেলার ১৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং তালিকাভুক্ত ৩৫টি কিন্ডারগার্টেনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৪০ হাজার ১৫৪টি পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে। তবে কয়েকটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক অভিযোগ করেন, বই পেতে তাদের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে টাকা দিতে হয়েছে। তাদের দাবি, টাকা না দিলে নানা অজুহাতে বই সরবরাহে বিলম্ব করা হয়, এমনকি বইও দেওয়া হয় না।
শিক্ষকদের ভাষ্য, জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে না পারলে অনেক শিশু বিদ্যালয়ে আসতে আগ্রহ হারায়। তাই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বাধ্য হয়েই তারা অর্থের বিনিময়ে বই সংগ্রহ করেছেন। প্রতিবছর এভাবে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে বলেও দাবি করেন তারা। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপও চান ভুক্তভোগীরা।
উপজেলার ভাউলাগঞ্জ আলহেরা ইসলামী কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “২০০৪ সালে আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনুমোদন নেওয়ার পরও নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছি। ২০২০ সাল পর্যন্ত ভালোভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে শুধু পরিবহন খরচ দিয়ে বই নিয়ে আসা হতো। এরপর থেকে টাকা ছাড়া বই দেওয়া হচ্ছে না। যেখানে অফিসের চাহিদা অনুযায়ী আগে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দেওয়া হতো, এখন সেখানে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া বই দিচ্ছে না। আর এই বইয়ের টাকা গ্রহণ করছেন শিক্ষা অফিসের কর্মচারী বাবু।”
তিনি আরও বলেন, “চলতি শিক্ষাবর্ষে একাধিকবার ঘোরার পরও তারা নানা ধরনের তালবাহানা করেছেন। আমাদের কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে উপায় না পেয়ে আরেকটি প্রতিষ্ঠান মর্ডান কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে মিলে ১৩ হাজার টাকা করে মোট ২৫ হাজার টাকা দিয়ে বই সংগ্রহ করেছি।”
স্কলার কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠানের বয়স তিন বছর হলেও আমি বই নিতে নানা হয়রানির শিকার হয়েছি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি বাবুর মাধ্যমে সব কাজ করানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ফাইল ঠিক নেই বলে বিভিন্ন রকম হয়রানিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।”
মর্ডান আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিব বাবু বলেন, “উপজেলার সব কিন্ডারগার্টেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে বই সংগ্রহ করে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও সেখান থেকে সংগ্রহ করি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দিতে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেখানে টাকার বিনিময়ে উপজেলা থেকে বই সংগ্রহ করতে হওয়ায় তারা আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়ছেন। একই সঙ্গে শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থের বিনিময়ে বই দেওয়ার অভিযোগ তুলে তারা সমস্যার সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেন বলেন, “বই বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে অভিযোগে নাম আসা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী বাবুও টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীত সাহা বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন