কয়েক লক্ষ টাকার ছাদ বাগান এখন মৃত গাছের কবরস্থান সবুজ বিপ্লব থেকে মরুভূমি: ছাদ বাগানের করুণ পরিণতি
কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠেছিল একটি পরিবেশবান্ধব, দৃষ্টিনন্দন ছাদ বাগান। লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ভবনকে সবুজে আচ্ছাদিত করা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষকে ছাদ বাগানে আগ্রহী করে তোলা। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই স্বপ্নের উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার এক বেদনাদায়ক উদাহরণে। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের ছাদে থাকা প্রায় দুই শতাধিক ফলদ গাছ এখন ধ্বংসের মুখে।
২০২১ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলামের উদ্যোগে পরিকল্পিতভাবে ভবনের ছাদে রোপণ করা হয়েছিল নানা জাতের ফলদ গাছ। আম, লিচু, আপেল, পেয়ারা, সফেদা, জাম্বুরা, ড্রাগন ফল, লেবু, কমলা, মাল্টা, ডালিম, বেল, জামরুলসহ ছিল অসংখ্য ফলের গাছ। একসময় পুরো ছাদজুড়ে সবুজের সমারোহ দেখা যেত। প্রশাসনিক কাজে আসা মানুষজনও এমন উদ্যোগ দেখে প্রশংসা করতেন।
কিন্তু এখন সেই দৃশ্য আর নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ গাছই মরে গেছে বা মৃত্যুর পথে। ভাঙা টব, শুকনো ডালপালা আর আগাছায় ছেয়ে গেছে ছাদের বড় একটি অংশ। কোথাও সেচের ব্যবস্থা নেই, নেই নিয়মিত পরিচর্যার কোনো চিহ্ন। কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়া একটি প্রকল্প কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এই অবস্থায় স্থানীয় সচেতন মহলের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি? সরকারি অর্থে নেওয়া একটি উদ্যোগ যদি টেকসই না হয়, তবে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায়? পরিকল্পনার সময় কি দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি?
এ বিষয়ে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ছাদ বাগানটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তার ভাষায়, গাছগুলো পুরনো হয়ে টবের ভেতরে শিকড়ের আধিক্য দেখা দিয়েছে, ফলে সেগুলো নষ্ট হয়েছে। নতুন করে গাছ লাগানো ছাড়া বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে তার এই বক্তব্য নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে। গাছ পুরনো হওয়া স্বাভাবিক হলেও নিয়মিত মাটি পরিবর্তন, শিকড় ছাঁটাই, সার ও সেচের ব্যবস্থা থাকলে কি এমন পরিণতি হতো? ছাদ বাগান দেখভালের জন্য কি কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা ব্যবস্থা ছিল না—এ প্রশ্নও তুলছেন অনেকেই।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদ বাগান শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না; এটি শহরের তাপমাত্রা কমাতে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এবং ভবনের ভেতরের পরিবেশ স্বস্তিদায়ক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব সুফল পেতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং দায়বদ্ধতা।
স্থানীয়দের আশা, নতুন করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ এবার যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা ও নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে তবেই এই ছাদ বাগান আবারও সবুজের বার্তা ছড়াতে পারবে। নইলে কয়েক বছর পর একই অবহেলার চিত্র ফিরে আসবে—এ আশঙ্কা থেকেই যায়।
ছবির ক্যাপশন: দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের ছাদ বাগান।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন