অসুস্থ রোগীকে কাঁধে নিয়ে এভাবেই পথ পাড়ি দেন চরবাসীরা
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার দুর্গম ইউনিয়ন ফুলছড়ির পিপুলিয়ারচর। এই চরের যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে এক অসহায় মা ও স্বজনদের কাধে করে অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের পথে ছুটতে দেখা গেছে। রাস্তাঘাট না থাকায় ও সঠিক সময়ে বাহন না পাওয়ায় শিশুকে চিকিৎসার জন্য কাঁধে করেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাদের। এলাকাবাসীর দাবি, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দ্রুত জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হোক।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে এসেও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মানুষ, সময়মতো চিকিৎসা ও চিকিৎসক না মেলায় গর্ভেই মারা যাচ্ছে অনাগত সন্তান। সামান্য জ্বর ও ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন ভুগছে মানুষ।
উপজেলার ফুলছড়ি চরের বাসিন্দা সুমাইয়ার হঠাৎ অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা অনুভব হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য মেয়েকে চেয়ারে বসিয়ে দুই পাশে রশি দিয়ে ভায়রাসহ দু'জন কাঁধে করে শহরে নিয়ে যান। সঙ্গে ছিলেন মা জোসনা বেগম ও বাবা মজিবর রহমান। এ ধরণের একটি বাস্তবচিত্র গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
স্থানীয়রা জানান, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সেবা তো দূরের কথা, জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে যাওয়ার মতো অ্যাম্বুলেন্স বা উন্নত কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থাও নেই।
ছবিতে দেখা যায়, উত্তাল রোদ আর যাতায়াতের দুর্গম পথে একজন স্বজন অসুস্থ শিশুকে কাঁধে নিয়ে পায়ে হেটে চলেছেন। তাদের পেছনে উৎকণ্ঠিত অভিভাবকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চলে গর্ভবতী মা কিংবা মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালের নেওয়ার জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বা পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স সেবা নেই। ফলে সামান্য অসুস্থ হলেও চরের মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, পিপুলিয়ারচরের মতো দুর্গম এলাকায় কোনো অসুস্থ রোগীকে বহনের একমাত্র ভরসা কলার গাছের ভেলা বা নৌকা। কিন্তু নদীতে যখন পানি থাকে না তখন রোগী নিয়ে দুর্গম বালুচর পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রশাসনের কাছে আমরা বারবার দাবি জানালেও আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থানীয় আব্দুস সালাম সরকার বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য স্থায়ীভাবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস কিংবা সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ বেঁচে যাবে।
ফুলছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মাজহারুন হান্নান বলেন, চরের এই মানুষদের আলাদা মানচিত্রের করে রাখা হয়েছে। তাদের দেশের মানুষ ভাবা হয় কি না সেটি একটি প্রশ্ন। আমরা ইউনিয়ন পর্যায় থেকে তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরলেও সেগুলোতে কেউই কান দেন না। বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখি না।
এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ এস, এম, তানভীর হোসেন জানান, চরাঞ্চল থেকে রোগী আনা সবসময় চ্যালেঞ্জিং। তবে এমন পরিস্থিতির জন্য দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থার প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'চরের রোগীদের ভোগান্তি কমাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনসহ বসে একটি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'
এ ব্যাপারে গাইবান্ধা সিভিল সার্জন মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে সপ্তাহে অন্তত দুদিন ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে পারবো।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন