গাইবান্ধায় তিস্তার ভয়াল থাবা: ২৪ ঘণ্টায় বিলীন ৫০ বসতভিটা, হুমকিতে স্কুল
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা নদীতে স্মরণকালের ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ‘ভোরের পাখি’ এলাকাসহ অন্তত ৫০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙনের কবল থেকে ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত সারা রাত ব্যস্ত সময় পার করেছেন চরাঞ্চলের মানুষ।
এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তিস্তার চরের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তবে দুর্গতদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত সরকারি দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে আসেননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পর থেকে ভোরের পাখি চর এলাকায় অর্ধশতাধিক বসতভিটা, স্কুল, মসজিদ, চার শতাধিক একর ফসলি জমিসহ রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও পাঁচ শতাধিক বসতভিটা, শত শত একর ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে উপজেলার কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চন্ডিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে ভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলার চেষ্টা ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভাঙনের মুখ থেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে চরের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সরকারিভাবে কিছু জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তা দিয়ে এই তীব্র ভাঙন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
কছিম বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল হক জানান, অনেক আগেই তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। নদীটি অসংখ্য শাখা নদীতে রূপ নেওয়ায় এখন অসময়েও ভাঙন অব্যাহত থাকছে। স্থায়ীভাবে নদীশাসন ও ভাঙন রোধ করা না গেলে চরের মানুষের এই কষ্ট কোনোদিন দূর হবে না।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, “ভারী বর্ষণের কারণে কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার চর ও ভোরের পাখি গ্রামে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভোরের পাখি চরের ৫০টি বসতভিটা, হাজারো গাছপালা, স্কুল ও মসজিদ নদীগর্ভে চলে গেছে। আমি নিজে বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে অবস্থান করে মানুষের দুর্ভোগ দেখেছি। এছাড়া লালচামার, ফুলমিয়ার মোড়, উজান বোচাগাড়ি ও ভাটি বোচাগাড়ি এলাকায় ব্যাপক ভাঙন চলছে। নদী খনন, ড্রেজিং ও স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। পাউবোর জিও ব্যাগ এখন কোনো কাজে আসছে না। স্থায়ী সমাধান না হলে এই উপজেলার মানচিত্রই বদলে যাবে।”
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন, “ভারী বর্ষণের কারণে কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দেওয়ার জন্য ইউপি চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।”
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া ছাড়া তাৎক্ষণিক আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। তিনি স্বীকার করেন যে, নদী খনন, ড্রেজিং এবং স্থায়ী নদীশাসনের মাধ্যমে গতিপথ একমুখী করা ছাড়া তিস্তার এই ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন