সন্তানের জন্য মায়ের আহাজারি, অপহরণের দেড় মাসেও মিলেনি সন্তানের সন্ধান
হাতজোড় করে বলছি, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন। কতদিন ধরে তাকে দেখিনি, একবার হলেও দেখার সুযোগ করে দিন। আদরের মেয়েকে জীবিত কিংবা মৃত—কোনো অবস্থাতেই খুঁজে না পাওয়ার বেদনায় কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে গেছে মা রুবি বেগমের চোখের পানি। প্রলাপ করছেন, কেউ কি শুনবেন না আমার কান্না? রুবি বেগম গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের শিমুলতাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। অপহরণের দেড় মাস পরও মিলছে না মেয়ে শেখ ফাহমিদা আকতার ফিরিস্তী (১৬)-এর সন্ধান।
মামলা সূত্রে জানা যায়, পুরাতন বাদিয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী শেখ ফাহমিদা আকতার ফিরিস্তী প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে একই উপজেলার গোবিন্দপুর বারিধারা গ্রামের মাহাবুর রহমানের ছেলে বখাটে যুবক লিখন মিয়া (২৫)-এর কুদৃষ্টির শিকার হচ্ছিল। লিখন তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করত। নিরুপায় হয়ে ফাহমিদা তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানালে তারা লিখনের বাবা মাহাবুর রহমানের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সন্তানের সুমতি ফেরানোর বদলে লিখনের বাবা-মা উল্টো তাকে প্রশ্রয় দিতে থাকেন এবং তাদের উসকানিতে ইভটিজিংয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
সবশেষ, গত ২৮ মে সন্ধ্যার দিকে ফাহমিদা যখন পার্শ্ববর্তী কিশামত গোপালপুর নানার বাড়ি যাচ্ছিল, তখন বখাটে লিখন এক হৃদয়বিদারক চক্রান্তের জাল বোনে। সুখানদিঘী থেকে বাদিয়াখালী পাকা রাস্তায় পৌঁছামাত্রই ফাহমিদাকে জোরপূর্বক অটোবাইকে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
মেয়ের নিখোঁজ সংবাদে দিশেহারা মা রুবি বেগম সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজে না পেয়ে নিরুপায় হয়ে গত ৩০ মে পাঁচজনকে আসামি করে সদর থানায় একটি অপহরণ মামলা (মামলা নং-৪৪/২৩৮) দায়ের করেন।
সত্য ও ন্যায়ের পথ বেছে নেওয়ার পর ফাহমিদার পরিবারের ওপর নেমে আসে নতুন বিপদ। মামলা দায়ের করায় ক্ষিপ্ত হয়ে আসামিরা ফাহমিদার পরিবারকে খুন-জখমের হুমকি দিতে থাকে। এখানেই শেষ নয়, নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে উল্টো গত ২ জুন এই অসহায় মা রুবি বেগমসহ পাঁচজনের নামে থানায় একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেয় অপরাধীরা।
এদিকে, গত দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বুকভাঙা কান্না আর চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মামলার বাদী রুবি বেগমের। আদরের মেয়েকে জীবিত কিংবা মৃত—কোনো অবস্থাতেই খুঁজে না পাওয়ার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। এর ওপর আসামিদের অব্যাহত হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনে পরিবারটি এখন চরম অসহায় ও হতাশ।
এ বিষয়ে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ভিকটিম কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার না করায় তার সঠিক লোকেশন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে মেয়েটিকে দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধারের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এলাকার সচেতন মহল বলছেন, সন্তানহারা বাবা-মা জানেন সন্তান হারানোর বেদনা। একদিকে বাবা-মাকে দেখতে সন্তানের আহাজারি, অন্যদিকে সন্তানকে দেখতে বাবা-মায়ের আহাজারি—এ যেন আবেগঘন এক বিষাদময় হৃদয়বিদারক দৃশ্যপট। তাই সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ আর সন্তানের আহাজারি সবার মনকে নাড়া দিলে সন্তান ফিরে পাবে মাকে, মা ফিরে পাবেন সন্তানকে। প্রয়োজন শুধু প্রশাসনের একটু সুনজর...।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন