এইচএসসি কেন্দ্র কমিটি গঠনে অনিয়ম, খবর প্রকাশের পরও নীরব কর্তৃপক্ষ
রংপুরের পীরগাছায় চলমান এইচএসসি পরীক্ষা পরিচালনার জন্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়াসহ কেন্দ্র কমিটি গঠনে ব্যাপক অনিয়ম-সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হওয়ার ৪ দিনেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। প্রকাশিত খবরে ব্যবহৃত নামের শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে অনুরোধের কৌশলে হুমকি দিয়ে লোভনীয় অফার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, উপজেলার দেবী চৌধুরানী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন অবসর গ্রহণ করায় উপাধ্যক্ষ তাহমিদুর রহমান সাবু ২০২৪ সালের মে মাস থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ায় তিনি পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বিধিনিষেধ থাকায় সহকারী অধ্যাপকদের মধ্যে একজনকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার বিধান আছে। সেই সুযোগে কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাফিউল ইসলামকে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। এমপিও ইনডেক্স ও বেতন-ভাতা প্রদান শিট অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী অধ্যাপক সাফিউল ইসলামের অবস্থান ২৬ নম্বরে। শুধু তা-ই নয়, এইচএসসি পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রস্তুতিমূলক সভা না করেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাহমিদুর রহমান সাবু নিজের মনগড়া মতে একটি কমিটি করেন। যে কমিটির সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক হল সুপার, আর জুনিয়র সহকারী অধ্যাপক হচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। নিজের সুবিধার্থে পরিপত্র অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করায় একেকজন সদস্য একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। এখানেই শেষ নয়, পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, এমন লোকজনও কেন্দ্রে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার্থী ও কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থানকারী সকলকেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করার তথ্য পাওয়া গেছে। নীতিমালা অনুযায়ী পরীক্ষার কেন্দ্র পরিচালনা কমিটি গঠন না করায় সিনিয়র শিক্ষকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরদিকে, থানা থেকে দেবী চৌধুরানী কলেজের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ছাড়াই প্রশ্ন নেওয়া ও উত্তরপত্র জমা দেওয়া হচ্ছে মোটরসাইকেলে করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত (ট্যাগ) অফিসার ছাড়া মোটরসাইকেলে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র পরিবহনের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেটি অমান্য করে খেয়ালখুশিমতো প্রশ্নপত্র মোটরসাইকেলে নেওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা।
এ বিষয়ে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাফিউল ইসলাম দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেন, "আমি একাই মোটরসাইকেলে প্রশ্নপত্র নিয়ে আসছি না, সবাই নিচ্ছেন। আমার জন্য আইন কি আলাদা?" তিনি আরও বলেন, "নিয়ম মেনে কমিটি করেছি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও খাতাপত্র সংরক্ষণকারী হিসেবে আমি নিজে দায়িত্ব পালন করছি। হল সুপার গোলাম মোস্তফা রুবেল, প্রশ্নপত্র উত্তোলনকারী হিসেবে আজমল হোসেন তাতন দায়িত্বে আছেন।"
এই সকল অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ৮ জুলাই দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকাসহ একাধিক জাতীয় দৈনিকে খবর পরিবেশিত হয়। পরিবেশিত সত্য খবরকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাহমিদুর রহমান সাবু রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক বায়ান্নর আলো নামক পত্রিকায় গত ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার প্রতিবাদের নামে একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।
সহকারী অধ্যাপক হাফেজ শফিকুল ইসলাম বলেন, "এই বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমাকে ডেকে নিয়ে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাদল ও দাতা সদস্য, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ইউনিয়ন সভাপতি হারুনুর রশিদ বাবলু বাড়াবাড়ি না করার জন্য আমাকে নির্দেশনা দেন। অতএব, কোনো সত্য কথাও আমি আর স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারছি না। যেহেতু আমি সেখানে চাকরি করি। তবে কেন ২৪ জন সিনিয়র শিক্ষককে বাদ দিয়ে ২৬ নম্বর শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার।"
চৌধুরানী ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাহমিদুর রহমান সাবু বলেন, "সম্মান রক্ষার্থে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। কলেজে আসেন, সাক্ষাতে কথা হবে। ফোনে কিছু বলা যাবে না।"
পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, "সকল ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরাও মেনে নিয়েছেন। আর মোটরসাইকেলে প্রশ্নপত্র নেবেন না।" অপর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, "প্রশ্নপত্র বিতরণ/গ্রহণে পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার/ট্যাগ উপস্থিত থাকাটা বাধ্যতামূলক না।"
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন বলেন, "আগামী রবিবার অফিস টাইমে ফোন দেবেন, আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ব্যবস্থা নিতে বলব।"
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন