নৌকা, জাল আর হাজারো আশা—নদীর বুকে বেঁচে থাকার লড়াই
গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেলেদের জীবন এক কঠিন সংগ্রাম। ভোর হতে না হতেই সকালের আলো ভেদ করে নদীর বুকে ভাসে ছোট্ট ছোট্ট অসংখ্য নৌকা। সেই নৌকার গলুইয়ে বসে থাকা জেলের হাতে একরাশ আশা আর কাঁধে বোনা জাল। এই জাল আর নৌকাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। নদী যাদের জীবন, আর স্রোত যাদের নিত্যসঙ্গী—এমনই এক রোমাঞ্চকর ও কষ্টের জীবনযাপন করেন এই নদীপাড়ের প্রান্তিক জেলেরা।
জেলেদের জীবন কখনোই মসৃণ নয়। প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে তাদের এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলে। কখনো প্রচণ্ড রোদ, কখনো মুষলধারে বৃষ্টি, আবার কখনো কালবৈশাখীর ভয়ংকর রূপ। নদী কখনো শান্ত, আবার কখনো রূপ নেয় রাক্ষুসে দানবে। কিন্তু পেটের তাগিদে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তাদের এই ভয়কে জয় করতেই হয়। একটি জরাজীর্ণ নৌকা আর সামান্য কিছু সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে তারা পাড়ি জমান অথৈ জলে। নদীতে জাল ফেলার পর প্রতিটি মুহূর্ত কাটে এক অজানা আশঙ্কায়।
জালে কি বাঘাইর বা চিতল মাছ ধরা পড়বে, নাকি শূন্য হাতে ফিরতে হবে? এই প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তা নিয়েই কাটে তাদের দিনের পর প্রহর। জালে যখন মাছ চকচক করে ওঠে, তখন তাদের ক্লান্ত চোখেমুখে খেলে যায় আনন্দের ঝিলিক। আবার কখনো সারাদিন জাল টেনেও মেলে না সামান্য মাছ। তখন সেই শূন্য জালই যেন হয়ে ওঠে তাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ।
নদীর বুকে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে মাছ বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চলে তাদের সংসার। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা—সবকিছুতেই থাকে চরম টানাপোড়েন। তবুও তারা স্বপ্ন দেখেন, একদিন তাদের সন্তানরা বড় হবে, এই কষ্টকর পেশা থেকে মুক্তি পাবে। পড়ালেখা শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে। এই হাজারো আশা আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়েই তারা আবার নতুন দিনের আলোয় নদীর দিকে পা বাড়ান।
এক সময়ের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র আজ অনেকটাই বালুচর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আর আগের মতো নদীতে মাছ না পাওয়ায় তাদের জীবন এখন আরও কঠিন। অনেকে বাপ-দাদার এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি অর্থাভাবে অনেকেই নিজের নৌকা কিনতে পারেন না। অন্যের নৌকায় কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে তাদের।
নদীই তাদের মা, নদীই তাদের জীবন। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে বেঁচে থাকা এই জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা খুবই দরকার। একটি নৌকা, একটি জাল আর বুকভরা আশা নিয়ে তারা নদীর বুকে এভাবেই লিখে যান বেঁচে থাকার এক চিরন্তন গল্প।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন