সর্বনাশা নদীর স্রোত, নদীপারের মানুষের কান্না
"নদীর এপার ভাঙে, ওপার গড়ে, এই তো নদীর খেলা—সকালবেলার ধনী রে তুই, ফকির সন্ধ্যাবেলা!"—প্রখ্যাত লোকসংগীতের এই অমোচনীয় বাণী যেন বাংলাদেশের নদীপাড়ের প্রতিটি মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রমত্তা নদীর নিষ্ঠুর স্রোত আর গ্রামীণ জনপদের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিচিত্র ও বেদনাবিধুর গল্প।
ভোরের মিষ্টি আলোয় যে কৃষক তাঁর সবুজ ফসলের মাঠ আর গোয়ালভরা গরু নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, দুপুরের প্রখর রোদে সেই স্বপ্ন নদীর গর্ভে তলিয়ে যেতে পারে। চোখের পলকে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এসব মানুষের একটাই ঠিকানা—নদীর বাঁধ। সেখানে খোলা আকাশের নিচে পলিথিন আর ছেঁড়া কাপড়ের ছাউনিতে শুরু হয় তাঁদের নতুন জীবন।
নদীর এই ভাঙন কেবল মানুষের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয় না, কেড়ে নেয় তাদের সোনালি অতীত ও ভবিষ্যৎ। চোখের সামনে বাপ-দাদার স্মৃতিবিজড়িত ঘর তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সহ্য করা খুব কঠিন। বৃদ্ধ রহিম উদ্দিনের ভাষায়, "নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তবু আমরা নদীর কূল ছেড়ে কোথাও যেতে পারি না। নদীই আমাদের মা, আবার নদীই আমাদের শত্রু।"
নদীভাঙা মানুষগুলো খুব কষ্ট সহ্য করতে পারে। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই তারা আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। তারা হার মানতে জানে না। ওপারে নতুন চর জাগলে তারা আবার সেখানে লাঙল চালায়, বীজ বোনে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাই নদীপারের মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শিল্পীর দোতারা বা একতারার সুরে যখন ভেসে আসে—"সকালেতে সূর্য উঠে, ডুববে সন্ধ্যাবেলা", তখন যেন নদীপারের মানুষের জীবনের গভীর বেদনাই মূর্ত হয়ে ওঠে। গানটি তাদের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সূর্য দেখার সাহস জোগায়।
নদীপারের মানুষের এই জীবনসংগ্রাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় প্রকৃতির শক্তি ও মানুষের টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতা। তাঁদের এই কান্না ও হাসির গল্প আমাদের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন